হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সময় সাধারণত রোগীর হাতে থাকে ছাড়পত্র, ব্যবস্থাপত্র কিংবা ওষুধের তালিকা। কিন্তু গাজীপুরের গ্রীন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে বিদায় নেওয়া রোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এক ভিন্নধর্মী উপহার-একটি জীবন্ত গাছের চারা। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গত তিন বছর ধরে নীরবে বাস্তবায়ন করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
জয়দেবপুর রেলক্রসিং সংলগ্ন মারকাজ রোডে অবস্থিত হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা শেষে বিদায় নেওয়া প্রতিটি রোগীকেই একটি করে দেশীয় ফলজ বা পরিবেশবান্ধব গাছের চারা উপহার দেওয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫টি চারা বিতরণ করা হচ্ছে। সেই হিসাবে গত তিন বছরে প্রায় ১১ থেকে ১৬ হাজারের বেশি গাছের চারা মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে, যা ভবিষ্যতে সবুজ পরিবেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশে বৃক্ষরোপণ কেবল পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর উপায়।
গ্রীন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবের স্বত্বাধিকারী মোঃ ইসমাইল মোল্লা বলেন, 'চিকিৎসার মাধ্যমে একজন মানুষকে সুস্থ করে তোলা যেমন আমাদের দায়িত্ব, তেমনি একটি সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলাও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। গাজীপুরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ কাজের জন্য বসবাস করেন। তারা চিকিৎসা নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার সময় একটি করে গাছের চারা সঙ্গে নিয়ে যান। আমার বিশ্বাস, আজকের এই ছোট চারাগুলো একদিন লক্ষ লক্ষ সবুজ বৃক্ষে পরিণত হবে এবং পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি গ্রীন হসপিটালের মানবিক সেবারও নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে। ইনশাআল্লাহ এই কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি-'একটি গাছ, একটি প্রাণ,সুস্থ মানুষ, সবুজ প্রকৃতি।’ হাসপাতালের প্রতিটি রোগীর হাতে একটি সবুজ উপহার তুলে দিয়ে আমরা শুধু একটি গাছ দিচ্ছি না, বরং পরিবেশ রক্ষার একটি বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছি।'
হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে গাছের চারা হাতে বাড়ি ফেরা গাজীপুর মহানগরের হাড়িনাল এলাকার শামসুন্নাহার শিলা বলেন, 'চিকিৎসা শেষে একটি গাছের চারা উপহার পাবো, তা কখনো ভাবিনি। এই উপহার আমার কাছে অনেক মূল্যবান। আমি চারাটি নিজের বাড়িতে রোপণ করব এবং পরিবারের সবাইকে আরও গাছ লাগাতে উৎসাহিত করব।'
কাপাসিয়া উপজেলার জালাল উদ্দিন বলেন, 'এটি শুধু একটি হাসপাতালের উদ্যোগ নয়, এটি পরিবেশ রক্ষার একটি সামাজিক আন্দোলন। দেশের অন্যান্য হাসপাতালও যদি এমন উদ্যোগ নেয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই লাখ লাখ নতুন গাছ রোপণ করা সম্ভব হবে।'
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) বাস্তব উদাহরণ হতে পারে এ ধরনের উদ্যোগ। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় গ্রীন হসপিটাল যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। একটি গাছের চারার মাধ্যমে রোগীর সঙ্গে হাসপাতালের মানবিক সম্পর্ক যেমন আরও গভীর হচ্ছে, তেমনি প্রতিটি চারা ভবিষ্যতের সবুজ বাংলাদেশ গড়ার একটি নতুন অঙ্গীকারও বহন করছে।