ভাষা, সংস্কৃতি আর হাজারো কিলোমিটারের ভৌগোলিক দূরত্ব সব বাধা পেরিয়ে ভালোবাসার টানে চীন থেকে যশোরে ছুটে এসেছেন চীনা যুবক লি বিং (৪১)। অনলাইন অ্যাপে পরিচয় থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক ধীরে ধীরে পরিণতি পায় পারিবারিক সম্মতিতে। এরপর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নতুন নাম মোহাম্মদ তাওহিদ রেখে যশোরের তরুণী তন্দ্রা খাতুনের (২৯) সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তিনি।
তন্দ্রা খাতুন যশোর সদর উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও মন্টু মোল্লার মেয়ে। অন্যদিকে লিবিং চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের উত্তরের একজন বাসিন্দা। তিনি একটি স্মার্ট লক (তালা) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
জানা গেছে, প্রায় আট মাস আগে ভাষা শেখার জনপ্রিয় অ্যাপ হ্যালোটক-এ তাদের প্রথম পরিচয় হয়। পরে উইচ্যাট-এ নিয়মিত কথোপকথনের মাধ্যমে একে অপরকে আরও কাছ থেকে জানতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব রূপ নেয় গভীর ভালোবাসায়। অবশেষে দুই পরিবারের সম্মতিতে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রেমের টানে গত ১৮ জুন বাংলাদেশে আসেন লি বিং। পরদিন তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজের নাম রাখেন মোহাম্মদ তাওহিদ। এরপর যশোর জজ কোর্টে ইসলামী রীতি অনুযায়ী তন্দ্রার সঙ্গে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
তন্দ্রা খাতুন জানান, তিনি যশোর সদর উপজেলার তথ্যকেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। অনলাইন পরিচয়ের পর দীর্ঘদিনের আন্তরিক যোগাযোগই তাদের সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি করে। তিনি বলেন, আমার প্রতি ভালোবাসার টানেই সে চীন থেকে বাংলাদেশে এসেছে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্তও সে নিজের ইচ্ছাতেই নিয়েছে। বিয়ের পর আমরা দুই দিন হোটেলে ছিলাম। এখন সে আমাদের বাড়িতে পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। আল্লাহর রহমতে আমরা খুব ভালো আছি। ভিসার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ হলে আমি তার সঙ্গে চীনে চলে যাব।
চীনা যুবক মোহাম্মদ তাওহিদ বলেন, বাংলাদেশে এসে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। স্ত্রী তন্দ্রা এবং তার পরিবারের সবাই তাকে আপন করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী খুবই ভালো মানুষ। তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন আমাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ আমার খুব ভালো লেগেছে। এখানকার মানুষের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
তাওহিদ জানান, তিনি দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বর্তমানে চীনের একটি স্মার্ট লক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
তন্দ্রার মা শিউলি বেগম বলেন, প্রথমে মোবাইল ফোনে তাদের পরিচয় হয়েছিল। পরে দুজনের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়। ছেলেটি এত দূর থেকে শুধু আমার মেয়েকে বিয়ে করতে বাংলাদেশে এসেছে। বিয়ের আগে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। আমরা খুশি মনেই তাদের বিয়ে দিয়েছি।
এদিকে চীন থেকে আসা এই নতুন জামাইকে একনজর দেখতে প্রতিদিনই তন্দ্রাদের বাড়িতে ভিড় করছেন আশপাশের কৌতূহলী মানুষ। বিদেশি জামাইকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের বিয়ের ঘটনা যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে। এ বিষয়ে তন্দ্রা বলেন, আমি তাকে দীর্ঘদিন ধরে জেনেছি ও বুঝেছি। তার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বর্তমানে ভিসার প্রক্রিয়া চলছে। সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে আমরা একসঙ্গে চীনে নতুন জীবন শুরু করব।
ভিন্ন দুই দেশের দুই মানুষের এই ভালোবাসার গল্প যেন প্রমাণ করে সত্যিকারের ভালোবাসার কাছে ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো বাধাই নয়।