- রায় শুনে রামিসার বাবা বললেন-‘আলহামদুলিল্লাহ’
- সন্তুষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ-আসামীপক্ষ উভয়েই
- তিনমাসের মধ্যে কার্যকর সম্ভব: আইনমন্ত্রী
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের ফাঁসির রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত এ মামলার রায়ে আদালত সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। গতকাল রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন। মাত্র ১৭ দিনের বিচারিক কার্যক্রম শেষে বহুল আলোচিত এ মামলার রায় দেওয়া হলো। এ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং আসামীপক্ষের আইনজীবীও।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সকাল ৮টা ২৯ মিনিটে আসামী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে আনা হয়। পরে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে প্রধান আসামী সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, রায় ঘোষণা কেন্দ্রকে করে অতিরিক্ত তিন প্লাটুন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬০ জন অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া আদালত এলাকায় আগে থেকেই নিয়োজিত প্রায় ৪০ জন সদস্য রয়েছেন। সব মিলিয়ে ১০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আরও বলেন, আদালতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও তুলনামূলক কম। আমরা কোনো ধরনের ঝুঁকি বা আশঙ্কা দেখছি না। তারপরও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত ১৯ মে নিজ বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী। ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়। ঘটনার দিনই প্রধান আসামী সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই সঙ্গে আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। পরদিন শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানাকে প্রধান আসামী এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারসহ অজ্ঞাতপরিচয়ের আরও কয়েকজনকে আসামী করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় মামলাটি করা হয়।
তদন্ত চলাকালে ডিএনএ প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারীদের দাবি, সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে। দ্রুত তদন্ত শেষে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠান।
১ জুন দুই আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষীদের মধ্যে শিশুটির বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এসময় প্রধান আসামী সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা চান। অপর আসামী স্বপ্না আক্তারও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ৪ জুন যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ডিএনএ প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত এবং মামলার অন্যান্য উপাদানের মাধ্যমে আসামীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামীদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানান। রায়ের আগে শনিবার এক গোলটেবিল বৈঠকে শিশুটির বাবা বলেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানের বিচার চান না, এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা চান যেখানে আর কোনো শিশুকে এ ধরনের নির্মম ঘটনার শিকার হতে হবে না। মামলাটির তদন্ত, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক সব মিলিয়ে মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
রায় শুনে যা বললেন রামিসার বাবা
শিশু রামিসার ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার মামলায় আসামী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। রায় শুনে তিনি বলেছেন- ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। যত দ্রুত রায় কার্যকর চাই। মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপাকালে এসব কথা বলেন রামিসার বাবা। রামিসার বাবা বলেন, আমরা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। এই রায়ে আমাদের আশা ও আকাঙ্খা মিটবে। রায়ে আমি শতভাগ খুশি হয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়ের মধ্যেই আমরা কাক্সিক্ষত রায় পেয়েছি। এ সময় তিনি বলেন, বিচারপতি, পুলিশ প্রশাসন ও সাংবাদিকসহ দেশের সব মানুষ যারা আমার এবং আমার পরিবারের বিপদের সময়ে পাশে ছিলেন আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। রামিসার বাবা বলেন, আমার মেয়ে হত্যার যে রায় আজ আদালত দিয়েছেন, সেই রায় আমরা দ্রুত কার্যকর দেখতে চাই।
রায়ে সন্তুষ্ট আসামীপক্ষ-রাষ্ট্রপক্ষ উভয়েই
শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামী সোহেল রানা আর তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। রায়ে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন আসামীপক্ষের আইনজীবীও। আসামীপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, অপরাধীরা তাদের অপরাধের বিচার পেয়েছেন। আমি সন্তুষ্ট। রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি আরও বলেন, সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ন্যায়বিচার পেয়েছি। অপরাধীরা অপরাধের বিচার পেয়েছেন। আমি সন্তুষ্ট।
এদিকে এই মামলার রায়কে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে মাইলফলক বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি বলেন, এ মামলার রায় চার কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এ রায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে এ ধরনের অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে। তিনি আরও বলেন, এই রায়ে আমরা প্রসিকিউশন পক্ষ সন্তষ্ট। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, একটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাজ হলো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ আবাস তৈরি করা। শিশুদের রক্ষা করা। কোনো শিশুর ওপর যখন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে, রাষ্ট্র তখন অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে যে এই বিচারকাজ শেষ করতে সহায়তা করেছে, তা অবশ্যই একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামীপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয় গত বৃহস্পতিবার। আদালত ৭ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। শিশুটি ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় গত ১৯ মে। সে হিসাবে ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা হলো।
‘খুনি খুনি’ স্লোগান জনতার
রায় ঘোষণার পর আদালতের এজলাসকক্ষে সোহেল ও স্বপ্না দুজনই নীরব ছিলেন। কাঠগড়া থেকে বের করার সময়ও কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। তবে রায় পড়ার আগে কাঁদতে থাকেন স্বপ্না। আর সোহেলকে দোয়া-দরুদ পড়তে দেখা গিয়েছিল। এদিকে, রায় ঘোষণার পর দুপুর ১২টার দিকে সোহেল ও স্বপ্নাকে কাঠগড়া থেকে বের করার সময় ‘খুনি খুনি’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষুব্ধ জনতা। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের ফাঁসি কার্যকরের দাবিও করেন অনেকে। রায় ঘোষণা ঘিরে সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
তিনমাসের মধ্যে কার্যকর সম্ভব : আইনমন্ত্রী
রায় তিনমাসের মধ্যে কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গতকাল রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ছয় কার্যদিবসের মধ্যে মামলার রায় দেওয়া হয়েছে এবং সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করা গেলে তিন মাসের মধ্যেই তা কার্যকর করা সম্ভব। আইনমন্ত্রী বলেন, আইনে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া না থাকলেও প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেই এই মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, রায় নিয়ে সরকার সন্তুষ্ট এবং আশা করা হচ্ছে, উচ্চ আদালতেও এটি বহাল থাকবে। রায় কার্যকর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনি ধাপগুলো অনুসরণ না করে দ্রুত কার্যকর করা হলে প্রশ্ন উঠতে পারে। আসামীরা চাইলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে, সেখানেও নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রী আরও জানান, আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সাতদিনের মধ্যে মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স কনফার্মেশনের জন্য হাইকোর্টে পাঠানো হবে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পেপার বুক প্রস্তুত করা হবে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের আসামী দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা এবং দ্রুত বিচারকার্য সম্পাদন করায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কার্য উপদেষ্টা কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী এ ধন্যবাদ জানান।
একইসঙ্গে এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি নৃশংস ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত পরিচালনা, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে। মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং দোষী ব্যক্তিরা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি পাবে।
এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আগামীতেও একই ধরনের পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠা বজায় রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে সভায় উপস্থিত অন্যান্য সদস্যবৃন্দ এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রশংসা করেন। সেইসঙ্গে ভবিষ্যতেও অপরাধ দমনে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলে তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
রামিসা হত্যার রায় সর্ম্পকে সংসদে আইনমন্ত্রী : রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাত্র কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে দেশের বিচার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই ঐতিহাসিক সফলতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীকে অবহিত করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ঘটনার পর যেখানে ভিক্টিমের পরিবার বিচার পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল যে তারা বিচার চায় না, সেখানে সরকারের বিশেষ তৎপরতা, পুলিশের দ্রুততম তদন্ত এবং আদালতের ছুটি বাতিলের অভূতপূর্ব সমন্বয়ে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে এ কথা বলেন মন্ত্রী।
আইনমন্ত্রী বলেন, গত ১৯ মে পল্লবী এলাকায় শিশু রামিসা নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ মূল দুই আসামীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। ঘটনার ভয়াবহতায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে ভিক্টিমের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় রামিসার পিতা দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে তিনি বিচার চান না, কারণ অতীতে এ জাতীয় ঘটনার বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সেই প্রতিশ্রুতির আলোকেই পুলিশ বাহিনী মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২৪ মে দুপুর ১২টার মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল করে এবং একই দিন বিকেলের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়।
বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ১ জুন থেকে নিম্ন আদালতগুলোর ১৫ দিনের গ্রীষ্মকালীন ছুটি। তবে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে গঠিত বিশেষ ট্রাইবুনালগুলোকে সচল রাখতে সরকারের অনুরোধে প্রধান বিচারপতি এই ট্রাইবুনালগুলোকে ছুটির আওতাবহির্ভূত রাখার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। মামলার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এবং আসামী পক্ষ যাতে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ২৪ মে আসামীদের জন্য ‘স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার’ বা সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন আদালত খোলার দিনই মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। পরদিন ২ জুন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করা হয় এবং পরবর্তী দুই দিনে আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়। শুক্র ও শনিবার আদালত বন্ধ থাকার পর আজ (রোববার) ৭ জুন মাত্র ৪১ মিনিটের রায় পর্যালোচনা ও আদেশ পাঠের মধ্য দিয়ে আদালত মূল আসামী সোহেল এবং তার সহযোগিতাকারী স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
তিনি বলেন, এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে রামিসার পরিবারের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। মাও সেতুং-এর ঐতিহাসিক উক্তি স্মরণ করে তিনি বলেন, কিছু মৃত্যু থাই পাহাড়ের মতো ভারী আর কিছু মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা। রামিসার নির্মম মৃত্যু পুরো জাতির বুকে পাহাড়সম ভার হয়ে চেপে বসেছিল, যা এই ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে হালকা হবে। একই সঙ্গে রামিসা হত্যাকাণ্ড ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ তদারকি অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী।