রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসিক এলাকা ‘গ্রিন সিটি’ প্রকল্পে বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাকাটায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী এসব যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা হলেও বিল মেটানো হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর ফলে সরকারের ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট ভবনের সরঞ্জাম কেনাকাটার হিসাবে দেখা যায়, ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকার পণ্যের দাম ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। অন্য একটি যন্ত্রের ক্ষেত্রে সরকারি মূল্য ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ১০ লাখ টাকার কম মূল্যের একটি প্যানেলের বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি টাকা। জেনারেটরের ক্ষেত্রেও প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়েক কোটি টাকা বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি ভবনের কাজে প্রায় ৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে। সাজিন এন্টারপ্রাইজ ও এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগকেও একইভাবে কয়েক গুণ বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন ও বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপেই অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে নিরীক্ষা বিভাগ।
সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি মালামালের অস্বাভাবিক দামের কোনো ব্যাখ্যা চায়নি। দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরির জন্য নিয়মানুযায়ী কোনো কমিটি গঠনের প্রমাণও নিরীক্ষা বিভাগ খুঁজে পায়নি। বাজারদরের তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দিতেই এই উচ্চমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ এই ব্যাখ্যা দিলেও তা গ্রহণ করেনি নিরীক্ষক দল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই ঘটনাকে বড় ধরনের আর্থিক লুটপাট ও মেগা দুর্নীতি হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি এই দুর্নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। এর আগেও রূপপুর প্রকল্পের আবাসন খাতের বহুল আলোচিত ‘বালিশ ও আসবাবপত্র’ কেনাকাটার দুর্নীতি দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারকে এসব অনিয়মের অভিযোগে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
এই নতুন অনিয়মের বর্তমান আইনি অবস্থা
যেহেতু অডিট রিপোর্টটি একেবারে নতুন, তাই এই নির্দিষ্ট ২১৪ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্রয়ের দুর্নীতির বিষয়ে দুদক এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো এফআইআর (FIR) বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করেনি।
অডিট অধিদপ্তর অবিলম্বে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এবং অপত্তিকৃত ১৮৬.৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করেছে।
সরকারের উচ্চপর্যায় ও তথ্য উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের যেকোনো মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি এবং দুদকের স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়ায় সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। ফলে অডিট রিপোর্টটি দুদকের হাতে পৌঁছালে এটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
রূপপুর প্রকল্প নিয়ে পূর্ববর্তী মামলার অগ্রগতি (বালিশ কাণ্ড)
এই প্রকল্পের আবাসন খাতের পূর্বের দুর্নীতিগুলোর ক্ষেত্রে দুদকের কিছু পদক্ষেপ চলমান রয়েছে:
পৃথক ৪টি মামলা: এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বহুল আলোচিত ‘বালিশ ও আসবাবপত্র’ দুর্নীতির ঘটনায় দুদক ২০১৯ সালে পৃথক ৪টি মামলা দায়ের করেছিল।
প্রকৌশলীদের গ্রেফতার ও জামিন: মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১১ জন প্রকৌশলীকে গ্রেফতার করা হলেও পরবর্তীতে তারা জামিনে মুক্তি পান।
তদন্তের স্থবিরতা ও সমালোচনা: চার্জশিট (অভিযোগপত্র) গঠনে দীর্ঘসূত্রতা এবং মূল অভিযুক্ত কিছু উচ্চপদস্থ প্রকৌশলীকে বাদ দেওয়ার চেষ্টার কারণে দুদকের ভূমিকা নিয়ে দেশের গণমাধ্যম ও আদালতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
বড় অঙ্কের অর্থ লোপাটের বৈশ্বিক তদন্তের রিট
ব্যক্তিগত কেনাকাটার বাইরেও রূপপুর প্রকল্পের মূল বাজেট (১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার) অস্বাভাবিক বাড়িয়ে বড় ধরনের অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছিল। এই সামগ্রিক অর্থ পাচার ও দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানে দুদকের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে, আদালত বিগত সময়ে রুল জারি করেন।