বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। মজলুম কাঁদে কারাগারে। তবে সে কান্না শোনা যায় না। যারা পাথর হয়ে যায়, তাদের কান্নায় অশ্রুও ঝরে না। এমন একজন মানুষ উমর খালিদ। এই মানবাধিকার কর্মী বিনা বিচারে ছয় বছর ধরে বন্দি আছে নরেন্দ্রমোদির কারাগারে। কারাগারে দিনের সবয়েছে কঠিন সময় হলো সূর্যাস্তের প্রহর। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কুখ্যাত তিহার জেলে বন্দি হাজারো মানুষকে যখন সেল থেকে বের করে সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত স্যাঁতসেঁতে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়, তখন উমর খালিদের আসহায়ত্ব আরো তীব্র হয়ে ওঠে। অথচ তিনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক এবং সেই রাষ্ট্রের একটি সংবিধানও আছে।
সম্প্রতি তিহার জেলে নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে উমর খালিদ বলেন, দেড়শ বছর আগে দস্তয়েভস্কি ও তার কারাজীবনের স্মৃতিকথায় সূর্যাস্তের সময়ের মানসিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তখন উপলব্ধি হয়, জীবনের আরেকটি দিন বন্দিদশায় কেটে গেল। উল্লেখ্য, উমর খালিদ ভারতে বেশ পরিচিত মানুষ তিনি প্রথমে একজন তেজস্বী ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরে ২০১৯ সালে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন উমর খালিদ। সেটিই ছিল নরেন্দ্রমোদির সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় গণআন্দোলন।
উমর খালিদকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মূল ষড়যন্ত্রকারী এবং ‘সহিংস উপায়ে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রে’ জড়িত থাকার অভিযোগ এনে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের কাছে উমর খালিদ মোদি সরকারের আমলে ভিন্নমত দমনের ‘মজলুম প্রতীক’ হয়ে উঠেছেন। তাদের অভিযোগ, গত ১২ বছর ধরে ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে বিচারব্যস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। উল্লেখ্য, মুসলিম ও অধিকারকর্মী উমর খালিদ বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শের কঠোর সমালোচক। তার অভিযোগ, বিজেপি ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে চায়। তিনি আরো অভিযোগ করেন, মোদি সরকার দেশের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হয়রানি ও নিপীড়নের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।
বিচার ছাড়াই উমর খালিদকে প্রায় ছয় বছর ধরে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের এমন আচরণকে অন্যায় বলে নিন্দা জানিয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি তার প্রতি সংহতি জানিয়ে হাতে লেখা একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন, যা নিয়ে ভারত সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিজেপি দাবি করেছে, ভারতের বিচারব্যবস্থা স্বাধীন এবং উমর খালিদের বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। মিথ্যা অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে বিশাল প্রচারযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা উমর খালিদের জন্য মোটেও সহজ বিষয় নয়। ৩৮ বছর বয়সি খালিদও স্বীকার করেন, বর্তমান বৈরি পরিবেশে মানসিকভাবে টিকে থাকা তার জন্য সহজ ছিল না। তবে দীর্ঘ কারাবাসেও মোদি সরকারের প্রতি তার অবস্থান বদলায়নি। বিনাবিচারে কোনো নাগরিকের এমন দীর্ঘ কারাবাস কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারত সরকারের এমন আচরণের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে। আমরা এই অধিকাকর্মীর মুক্তি চাই। আমরা জানি, অন্যান্য দেশের মতো ভারতেরও একটি সংবিধান আছে। সেই সংবিধানে ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ চেতনাকে সমুন্নত রাখা হয়েছে। ফলে ভারতে ধর্ম, বর্ণ ও চিন্তার পার্থক্যের কারণে কারো নিপীড়িত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। তাই প্রশ্ন জেগেছে, মোদি সরকার কি সংবিধান মান্য করে চলছে?