মুহাম্মদ নূরে আলম

আধুনিক কাতারের প্রধান রূপকার, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং বাংলাদেশের কোটি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল রোববার সকালে ৭৪ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে কাতারজুড়ে ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান পৃথক পৃথক শোকবার্তায় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং আধুনিক কাতার বিনির্মাণ ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। গতকাল রোববার আমীরের কার্যালয় থেকে তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

এদিকে কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির বাবা সাবেক আমীর শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির ইন্তিকালে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে দোহায় বাংলাদেশ দূতাবাস এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি। গতকাল রোববার দূতাবাসের এক বার্তায় বলা হয়, কাতারের অভূতপূর্ব রূপান্তরের রূপকার অসামান্য দূরদর্শী এই নেতা আজীবন বাংলাদেশ ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। তার রাষ্ট্রনায়কোচিত অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ কমিউনিটি এবং দূতাবাস কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, আল থানি পরিবার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম কাতার সরকার ও জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ গভীর শোক জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি এবং মানবিক সংকটে তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া সহযোগিতার হাত বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় তাঁকে অমর করে রাখবে। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব রাজনীতিতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানিকে আধুনিক কাতারের অন্যতম রূপকার হিসেবে দেখা হয়। তার শাসনামলে কাতারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ গতিশীল ছিল। তিনি ২০০৫ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা সফর করেছিলেন। ২০২৪ সালে তার ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বাংলাদেশ সফরে এলে সেটিই ছিল প্রায় ১৯ বছর পর কাতারের কোনো আমিরের প্রথম ঢাকা সফর।

শেখ হামাদ বিন খলিফার জীবনী: ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে দোহায় জন্মগ্রহণ করা শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ছিলেন এক অনন্য সাধারণ দূরদর্শী নেতা। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি ১৯৯৫ সালের জুনে কাতারের আমীরের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর ১৮ বছরের (১৯৯৫ থেকে ২০১৩) শাসনকাল ছিল কাতারের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। তিনি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন কাতার ছিল পারস্য উপসাগরের একটি সাধারণ ছোট রাষ্ট্র। কিন্তু শেখ হামাদ তাঁর প্রজ্ঞা এবং অনন্য অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে কাতারকে বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান হাবে পরিণত করেন। তাঁর সময়েই কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস শিল্পের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটে, যার ফলে ২০০৬ সালের মধ্যে কাতার বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত হয়। তাঁর শাসনামলে দেশটির জিডিপি প্রায় ২৪ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। কেবল অর্থনীতিই নয়, বিশ্ব গণমাধ্যমের চিত্র বদলে দেওয়া আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’ ১৯৯৬ সালে তাঁর একটি বিশেষ ডিক্রির মাধ্যমেই যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর ছেলে ও বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এবং এরপর থেকে ‘ফাদার-আমির’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য অবদান: ফাদার-আমীর শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি কেবল কাতারের নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মানুষের এক পরম সুহৃদ। তাঁর দূরদর্শী অভিবাসন নীতির কারণে ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে এবং ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে লাখো বাংলাদেশী শ্রমিকের জন্য কাতারের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়। তাঁর শাসনামলেই কাতারে বাংলাদেশী প্রবাসীদের সংখ্যা কয়েক লক্ষে উন্নীত হয়। বর্তমানে কাতারে যে প্রায় ৪ লক্ষাধিক বাংলাদেশী কর্মরত আছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তার মূল ভিত্তি ও আইনি সহজীকরণ সম্পন্ন হয়েছিল শেখ হামাদের হাত ধরেই। কাতারের উন্নয়নযজ্ঞে (যেমন ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপের অবকাঠামো নির্মাণসহ মেগা প্রজেক্টসমূহ) বাংলাদেশী নির্মাণশ্রমিক, প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের অংশগ্রহণকে তিনি সর্বদা উচ্চ মূল্যায়ন করতেন। প্রবাসীদের কাজের পরিবেশ উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য তিনি বিশেষ শ্রম আইন সংস্কার করেছিলেন। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাতার যে বর্তমানে প্রধান দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহকারী দেশ, এই জ্বালানি কূটনীতির রূপরেখাও শেখ হামাদের আমলেই তৈরি হয়েছিল।

ফাদার-আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রত্যক্ষ নির্দেশনা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ও দাতব্য সংস্থাসমূহের (যেমন: কাতার ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট-কিউএফএফডি, কাতার চ্যারিটি, এবং থানি বিন আব্দুল্লাহ ফাউন্ডেশন-আরএএফ) মাধ্যমে বাংলাদেশ গত তিন দশকে শত শত মিলিয়ন ডলারের অনুদান ও মানবিক সহায়তা পেয়েছে। ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ যখন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ল-ভ- করে দেয়, তখন ফাদার-আমির শেখ হামাদের বিশেষ নির্দেশে কাতার রেড ক্রিসেন্ট ও কাতার ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিশেষ অনুদান পাঠানো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের আশ্রয়কেন্দ্র ও হাসপাতাল নির্মাণে কাতার সরাসরি অর্থায়ন করে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলে কাতার সরকার ও কাতার ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট ব্যাপক আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। বৈশ্বিক মানবিক তহবিলের অংশ হিসেবে এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও আশ্রয় নিশ্চিত করতে কাতার এ পর্যন্ত ১৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি (প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা) বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে নিবেদিত করেছে। ২০১৮ সালে বোরো ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিল্ড হাসপাতাল সচল রাখতে সরাসরি ৪ মিলিয়ন কাতারি রিয়াল অনুদান দেওয়া হয়।

ফাদার-আমিরের দূরদর্শী স্বাস্থ্য কূটনীতির অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে শিশু অন্ধত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৯৫ কোটি টাকা) অনুদানের মাধ্যমে একটি মেগা প্রকল্প চালু করা হয়। এই প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৬.৭ মিলিয়নেরও বেশি শিশুর চোখ পরীক্ষা ও বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।

শোক জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি: কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার কাতারের বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে লেখা এক চিঠিতে শোক প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। চিঠিতে তারেক রহমান লিখেছেন, বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে আপনার (বর্তমান আমির) রাজপরিবার, সরকার এবং কাতারের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই।

সরকারপ্রধান চিঠিতে উল্লেখ করেন, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, যার নেতৃত্ব কাতারকে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধশালী এবং বিশ্বব্যাপী সম্মানিত জাতিতে রূপান্তরিত করেছে। আঞ্চলিক শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তার অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তারেক রহমান চিঠিতে আরও লিখেছেন, বাংলাদেশ কাতারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অত্যন্ত মূল্যায়ন করে, যেটি পারস্পরিক বিশ্বাস, ভাগ করা মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্কের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে লালিত হয়ে আসছে। গভীর শোকের এই মুহূর্তে আমার চিন্তাভাবনা এবং প্রার্থনা আপনার, রাজপরিবার এবং কাতারের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের সঙ্গে রয়েছে। আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহ কাছে মরহুমের রুহের জান্নাতুল ফেরদৌস দান করার জন্য এবং আপনা এবং রাজপরিবারের শোকাহত সদস্যদের ধৈর্য, শক্তি এবং সান্ত¡না দান করার জন্য প্রার্থনা করছি।

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমীরের শোক: কাতারের আধুনিক রূপকার ও সাবেক আমীর শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল রোববার এক শোক বার্তায় জামায়াত আমীর বলেন, ‘ শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ১২ জুলাই ৭৪ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আমি তার ইন্তিকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি।’

তিনি বলেন, ‘ শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর এক দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতা। ১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাতারের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার গতিশীল নেতৃত্বে কাতার শিক্ষা, অর্থনীতি, জ্বালানি খাত ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। বিশেষ করে ২০১৩ সালে তার ছেলে বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।’

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘তার ইন্তেকালে বিশ্ববাসী এবং বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহ একজন প্রজ্ঞাবান ও দরদী অভিভাবককে হারাল। বাংলাদেশ ও কাতারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং এ দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তার অবদান অনস্বীকার্য। আমরা বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কাতারের রাজপরিবার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম কাতারবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছি। একই সঙ্গে তিনি শোকসন্তপ্ত রাজপরিবার ও কাতারের জনগণকে এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ধৈর্য ধারণের তাওফিক কামনা করেন।”