সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করে সম্পূরক কার্যসূচি হিসেবে বিল উত্থাপন ও তড়িঘড়ি করে কোনো প্রকার যাচাই বা আলোচনা ছাড়া পাশ করা, অন্যদিকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে প্রচলিত চর্চার ব্যত্যয় ঘটিয়ে সরকারি দল একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংসদীয় কমিটিসমূহের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানায় সংস্থাটি।

গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কার্যপ্রণালী-বিধির ৭৭ বিধি অনুযায়ী, কোনো মন্ত্রী বিল উত্থাপনের পর বিলটি স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ ও বাছাই কমিটিতে প্রেরণ অথবা জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রচারের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিলটি বিবেচনার জন্য গ্রহণের প্রস্তাব করতে পারেন। তবে প্রচলিত সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী বিল সাধারণত স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ‘‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’’ এর ক্ষেত্রে এর কোনোটাই করা হয়নি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত জনমত যাচাই বা বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব আমলে নেওয়া বা সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ারও সুযোগ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেছেন, সংসদ সদস্যদের কাছে বিলের অনুলিপি সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিলটি সম্পর্কে প্রস্তাব করতে পারেন না। এক্ষেত্রে বিল উত্থাপনের কমপক্ষে তিন দিন আগে সংসদ সদস্যদের কাছে বিলের অনুলিপি সরবরাহ করার রেওয়াজ থাকলেও, এই বিলটি উত্থাপনের ঠিক আগমুহূর্তে এর অনুলিপি সংসদ সদস্যদের সরবরাহ করা হয়। ফলে বিলটি যাচাইয়ের জন্য একদিকে যেমন সংসদ সদস্যদের কোনো বাস্তবসম্মত সুযোগ দেওয়া হয়নি, অন্যদিকে কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে একতরফাভাবে আইনটি পাশ করা হয়েছে।’

অধিকন্তু, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, ২০২৬ ও পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে সংসদে উত্থাপন করা হয়। এ ছাড়া, বিরোধী দলের মতামত ও আপত্তি উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আরও কয়েকটি বিল পাস করার ঘটনা ঘটেছে। এমন একতরফাভাবে বিল পাসের প্রক্রিয়া আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও সংসদীয় বিধি লঙ্ঘন করায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কর্তৃত্ববাদী আমলের সংসদের সাথে বর্তমান সংসদের পার্থক্য কোথায়, মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালী বিধির ১৮৮ উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, যিনি ইতোমধ্যে স্বার্থের সংঘাতে দুষ্ট বহুবিধ কর্মকান্ডের জন্য বিতর্কিত হয়েছেন, তাকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের পক্ষে অন্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর কতটুকু নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের যে মূল উদ্দেশ্য তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।

তিনি বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদের ধারা ২৪, যে ব্যাপারে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত হয়ে অঙ্গীকার করেছে যে, জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদের আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যরা সভাপতি নির্বাচিত হবেন। সেই অনুযায়ী প্রায় ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে হওয়ার কথা। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে যা ঘটেছে তাতে শুধু জুলাই সনদের অঙ্গীকার কাগজেই সীমাবদ্ধ রাখা নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারকেও অর্থহীন হিসেবে পরিণত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।’