- গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন
- এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি শনাক্তের পর মেরামতে আরো সময় লাগবে
- গ্যাস সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত ৭টি সার কারখানার মধ্যে মাত্র ২টি চালু
- বাসা-বাড়িতে গ্যাস না থাকায় রান্নায় ভোগান্তি
সহসাই কাটছে না গ্যাস সংকট। সপ্তাহখানেক ধরেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে চরম গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বাসা-বাড়িতে রান্নায় ভোগান্তির পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালকরা। গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। চালকরা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গ্যাস নিতে পারছেন না। চালকরা বলছেন, এই অবস্থা চলমান থাকলে সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যাবে তাদের।
গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিন রাজধানীর বেশ কয়েকটি সিএনজি পাম্প ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর মগবাজারের সিএনজি পাম্পের দীর্ঘ সারি। পাম্প থেকে দূরে ইস্কাটন রোডের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে সিএনজির দীর্ঘ সারি। এছাড়া, মগবাজার রেলগেট এলাকায় সিএনজি পাম্পে গাড়ির সারি মগবাজার মোড় পর্যন্ত চলে এসেছে।
চালকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দিনে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে গ্যাস নিতে। এতে দৈনিক আয় কমেছে তাদের। দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে সংসার চালিয়ে টিকে থাকা কষ্টকর হবে।
সিএনজি চালক মনিরুল বলেন, ৩ ঘণ্টা হলো দাঁড়িয়ে আছি। এখনও গ্যাস নিতে পারলাম না। শুক্রবারও প্রায় ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে গ্যাস নিতে হয়েছে। দিনের বেশি সময় চলে যাচ্ছে গ্যাস নিতেই। আরেক সিএনজিচালক রুবেল বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে গ্যাসের এই সমস্যা চলছে। আমরাও ভোগান্তিতে আছি। আয় কমে যাচ্ছে আমাদের। জমার টাকা দিয়ে এখন আর কিছু থাকে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস সংকটে পড়েছেন।
এদিকে, শুক্রবার রাতে রুপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের এলএনজি ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌ. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এফএসআরইউ কবে নাগাদ ঠিক হচ্ছে সেটি এখনও বলতে পারছি না। বিদেশি প্রকৌশলীরা এসেছেন, তারা কাজ করছেন। এই মুহূর্তে ঠিকঠাক করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।
এদিকে পাঁচ দিনেও কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের ত্রুটি মেরামত করা যায়নি। এই কারণে দেশজুড়ে গ্যাস সংকট অব্যাহত রয়েছে। এলএনজি টার্মিনালের বয়লার ক্যাবলে আগুনের কারণে ত্রুটি দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার বিদেশি বিশেষজ্ঞদের আনার পর ত্রুটি শনাক্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যে ত্রুটি মেরামত হবে বলে জানা গেছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন জানান, বৃহস্পতিবার বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আসার পরই কাজ শুরু হয়েছে। কবে নাগাদ টার্মিনাল সচল হবে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। আরও দুই-চার দিন লেগে যেতে পারে।’
গত ২১ জুলাই কারিগরি ত্রুটির কারণ দেখিয়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রকৌশলীরা টার্মিনালের ত্রুটি শনাক্ত করতে না পারায় বিদেশি বিশেষজ্ঞ আনা হয়।
পেট্রোবাংলার উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তারিকুল ইসলাম খান শনিবার সন্ধ্যায় বলেছেন, ‘ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। এখন সেটি মেরামতের কাজ চলছে। বয়লার ক্যাবল থেকে টার্মিনালে আগুন লেগেছিল। এরপর টার্মিনাল বন্ধ রাখা হয়। আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করছে এক্সিলারেট এনার্জি। আরেকটি সামিট গ্রুপ।
সূত্র জানায় , বেশ কয়েক বছর ধরে দেশে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম। এই দুটি টার্মিনাল থেকে ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়। কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে সরবরাহ আরও কমে গেছে। দেশে প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে। স্বাভাবিকভাবেই এলএনজির সরবরাহ কমলে গ্যাস সংকট বেড়ে যায়।
টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর গত ২২ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এক অনুষ্ঠানে বলেন, এলএনজি গ্রহণ ও রূপান্তরের জন্য মাত্র দুটি টার্মিনাল থাকায় একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়।
আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে ল্যান্ড বেইজড ও মহেশখালীতে ‘কুতুবজোম’ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। সরকার পায়রা বন্দর এলাকায় আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের ওপর পড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস নিতে পারছে না। ফলে কয়েকটি স্থানে সিএনজি নিতে দীর্ঘ লাইন এবং জনদুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।
সারের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত:
বারবার গ্যাস সংকট, পুরোনো কারখানা ও বৈশ্বিক কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্নের কারণে দেশে রাসায়নিক সারের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সারের বার্ষিক চাহিদা মেটাতে আমদানি নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ৭টি সার কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি। তবে উৎপাদন করতে পারে দুই-তৃতীয়াংশের কম।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারের চাহিদা ছিল ৬৬ লাখ টন। এর বিপরীতে এসব কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন। ফলে সারের মোট চাহিদার ৮৩ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ৬৭ লাখ ৪৭ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে দেশে উৎপাদন হয়েছিল ১২ লাখ ৪৪ হাজার টন সার।
উৎপাদন ও চাহিদার এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ও মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর বাইরে বহুজাতিক যৌথ উদ্যোগ কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড (কাফকো) প্রতিবছর বিসিআইসিকে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টন ইউরিয়া সরবরাহ করে। তবে এ বছর পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তাদের উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে। ইউরিয়া, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ও মিউরেট অব পটাশের (এমওপি) বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৬৭ হাজার টন সার আমদানি করা হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে প্রায় ৪৭ লাখ ৮০ হাজার টনে পৌঁছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় ৪৮ লাখ টনেরও বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৭ লাখ ৭৭ হাজার টন ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার টন সার আমদানি হয়েছে।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ৭টি সার কারখানার মধ্যে মাত্র দুটি চালু রয়েছে। গ্যাস ও অন্যান্য কাঁচামালের সংকটে বাকি ৫টি কারখানা গত ৪ মার্চ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এখনো সেগুলো চালু হয়নি।
বিসিআইসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশে সারের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ফলে সরকারকে বেশি পরিমাণে সার আমদানি করতে হচ্ছে।
এমওপির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানি নির্ভর, আর ডিএপি ও টিএসপির দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সংস্থার গ্যাসভিত্তিক সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটের মধ্যেও গত অর্থবছরে আমরা ১১ লাখ ৬ হাজার টন সার উৎপাদন করেছি। সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলে আরও ২২ থেকে ২৫ লাখ টন অতিরিক্ত সার উৎপাদন করা সম্ভব হতো।’