যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে এক রুদ্ধশ্বাস ও মহানাটকীয় লড়াইয়ের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়ের চরম উত্তেজনা পেরিয়ে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অপরদিকে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিল সুইজারল্যান্ড। আলবিসেলেস্তেদের এই স্মরণীয় জয়ের নায়ক হুলিয়ান আলভারেজ, যার জাদুকরী এক দূরপাল্লার শটে ভাঙল সুইসদের ইস্পাত কঠিন প্রতিরোধ। এই জয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিজেদের অপরাজিত থাকার ঐতিহাসিক রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখল আর্জেন্টিনা। আগামী বুধবার আটলান্টায় শেষ চারের মহাদ্বৈরথে তাদের মুখোমুখি হবে ১৯৬৬ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, যা ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিতে যাচ্ছে এক ধ্রুপদী মহারণ।
ম্যাচ শুরুর আগে মাঠজুড়ে নেমে আসে এক আবেগঘন পরিবেশ। সদ্য প্রয়াত আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি মিডফিল্ডার আন্তোনিও রাতিনকে স্মরণ করে লিওনেল মেসিরা বাহুতে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন। একই সঙ্গে টুর্নামেন্ট চলাকালীন অকালে প্রয়াত দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার জেইডেন অ্যাডামসের স্মরণে দুই দলের খেলোয়াড়রা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। তবে ম্যাচের বাঁশি বাজার পরপরই শুরু হয় মাঠের মূল যুদ্ধ। শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে খেলা অপরিবর্তিত একাদশ নিয়েই সুইসদের বিপক্ষে দল মাঠে নামান আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি। ম্যাচের শুরুতেই লিড নেয় আলবিসেলেস্তেরা। ১০ মিনিটে অধিনায়ক লিওনেল মেসির নিখুঁত কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে দুর্দান্ত হেডে লিভারপুল মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টার জাল খুঁজে নিলে উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম।
পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি সুইজারল্যান্ড। প্রথমার্ধে গোল খাওয়া বাদে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সমানতালে লড়াই করে তারা। একাধিকবার সমতায় ফেরার সুযোগ তৈরি করলেও ফিনিশিংয়ের অভাবে গোল পায়নি সুইসরা। বিরতির পর ৫০ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের অবিশ্বাস্য ডিফেন্ডিং ও সুইস ফরোয়ার্ডদের ব্যর্থতায় রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা। তবে আক্রমণের ধারাবাহিকতায় ৬৭ মিনিটে সফল হয় সুইজারল্যান্ড। রিকার্দো রদ্রিগেজের চমৎকার পাস থেকে বল পেয়ে ড্যান এনদোয়ে নিখুঁত শটে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষককে পরাস্ত করলে ১-১ সমতায় ফেরে ম্যাচ। এর পাঁচ মিনিট পর নাটকের নতুন মোড় আসে। ৭২ মিনিটে বক্সে ডাইভ দেওয়ার অপরাধে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন সুইস স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলো। শুরুতে রেফারি লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড দেখালেও ভিএআর এবং লাইন্সম্যানের সহায়তায় ডাইভিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পারেদেসের কার্ড বাতিল করেন এবং এমবোলোর লাল কার্ড বহাল রাখেন।
১০ জনের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে এরপর একের পর এক আক্রমণ করেও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে সুইস দুর্গ ভাঙ্গতে পারেনি আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ১৫ মিনিটেও খেলা ১-১ সমতায় থমকে থাকে। টুর্নামেন্ট জুড়ে অফ-ফর্মে থাকা হুলিয়ান আলভারেজকে নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছিল, ঠিক তখনই ১১৪ মিনিটে ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া এক রকেট গতির শটে সুইস জাল কাঁপিয়ে আর্জেন্টিনার ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচ শেষের ঠিক আগ মুহূর্তে অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে সুইজারল্যান্ডের জলে বল পাঠিয়ে সমর্থকদের উল্লাসে মাতিয়ে তুলেন লাওতারো মার্তিনেজ। ফলে ৩-১ গোলের কষ্টার্জিত অথচ মহাকাব্যিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্কালোনির দল।
ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বসিত আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক লিওনেল মেসি বলেন, “জয়ের জন্য আমি খুবই খুশি। এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি ম্যাচ। আমরা জানতাম সুইজারল্যান্ড তীব্রতা নিয়ে খেলবে এবং সেটাই হয়েছে। এই ধাপটি পার হতে পারা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখন কিছুটা স্বস্তিতে পরবর্তী ম্যাচের প্রস্তুতি নেওয়া যাবে।” নিজের ৩৯ বছর বয়সেও দলের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে মেসি যোগ করেন, “এই দল সবসময় লড়াই করে, কখনো থামে না। আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছি, দুটি কোপা আমেরিকা জিতেছি এবং এখন আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এটা সত্যিই অসাধারণ।” আটলান্টায় ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি খুবই বিশেষ অনুভূতি। ইংল্যান্ড বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল। এমন দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে লড়াটা বিশেষ কিছু। এখন লক্ষ্য বিশ্রাম নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া।”
প্রয়োজনের মুহূর্তে জ্বলে ওঠা স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজ তার ম্যাচ জয়ী গোলটিকে ‘চমৎকার ও স্বস্তিদায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, ফুটবল ইতিহাস আর্জেন্টিনার পক্ষে কথা বলছে, কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেমিফাইনালে উঠে কখনোই হারেনি ল্যাটিন আমেরিকার এই পরাশক্তি। আটলান্টার সেমিফাইনালে থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে সেই ধারা বজায় রেখে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠাই এখন আলবিসেলেস্তেদের মূল লক্ষ্য।